Wednesday, March 25, 2009

হজ্বের সেই দিনগুলি - ৪



হজ্বের নানা রকম প্রস্ততির সাথে সাথে একটি বিষয় সবসময় লক্ষ্য রাখা উচিত যেন কোন ক্রমেই স্বাস্থ্যহানি না ঘটে । এবং হজ্ব ফ্লাইটের আগে বিশেষ করে ১০/১২ দিন আগে থেকে সব প্রস্ততি শেষ করে বিশ্রামে থাকাটা ভাল। কারন বিমানে উঠার পর থেকে পরবর্তী সময়গুলো বেশ ব্যস্ততায় কাটাতে হয় এবং একেবারে ব্যাগ লাগেজ সহ হোটেলে না উঠা পর্যন্ত বিশ্রাম নেয়া সম্ভব হয়না। আর এয়ারপোর্টে অল্প কিছু আনুষ্ঠানিকতা সারতে বেশ সময় লেগে যায় ।কারন এসময়টা মদীনা বা জেদ্দা এয়ারপোর্টে বিশ্বের নানা দেশ থেকে প্রতিঘন্টায় হাজার হাজার হাজী এসে ভিড়তে থাকে ।



হজ্বের অল্প কিছুদিন আগে রওয়ানা হলে বেশ ঝক্কি ঝামেলা পোহাতে হয় হাজীদের । একে নতুন দেশ অচেনা স্থান ,গরম আবহাওয়া মানিয়ে নিতে নিতে হজ্বের মত কষ্টকর ইবাদত শুরু হয়ে যায় ।ফলে অনেকে অসুস্থ হয়ে যায় ।তাই সবচেয়ে উত্তম হয় হাজীরা বিশেষ করে বয়োবৃদ্ধ যারা তারা যদি হজ্বের ৮/১০ দিনআগেই মক্কায় পৌঁছে যায় ।ফলে হজ্ব শুরু হওয়ার আগেই তারা সেখানকার আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে।



অবশেষে দেখতে দেখতে চলে এল সেই মাহেণ্দ্রক্ষন । সব আত্মীয়স্বজনদের সাথে দেখা করে মাকে নিয়ে রওয়ানা হলাম জিয়া আন্তজার্তিক এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে ।বিকাল ৪টায় সউদিয়া এয়ারলাইন্সে আমাদের নির্ধারিত হজ্ব ফ্লাইট।সেই মোতাবেক আমরা ৩ ঘন্টা আগেই বিমান বন্দরে পৌঁছে গেলাম। সেদিন সকাল থেকে আমাদের এজেন্সী ভিসা না পাওয়ায় আমরা বেশ টেনশনে ছিলাম ।তবে আল্লাহ এর অশেষ রহমতে যাওয়ার আগেই সেটা পেয়ে গিয়েছিলাম।তবে সমস্যা বাধলো আমাদের দলে আমার মা আর আনিস ভাইয়ের পাসপোর্ট নিয়ে ।ভুল করে এজেন্ট তাদের পাসপোর্ট রেখে এসেছিলো অফিসে । এদিকে সমস্ত হাজীরা যখন একে একে ইমিগ্রেশনে ঢুঁকে পড়ছিলো তখন আমরা কজন অধীর আগ্রহে তীর্থের কাকের মত অপেক্ষা করছিলাম আমাদের এজেন্টের জন্য । অবশেষে তাকে দেখা গেলো উর্ধ্ব শ্বাসে দুহাতে দুটো পাসপোর্ট উচু করে ধরে বিজয়ীর বেশে ছুটে আসছে । আমরা অবশেষে ৩০ মিনিট বাকী থাকতে কোন মতে দৌঁড়ে ঢুকে পড়লাম ইমিগ্রেশন কাউন্টারে । এখানে আমাদের সাহায্যর হাত বাড়িয়ে দিলো আমার স্কুলের বন্ধু রাজু এবং তপন আমার স্ত্রীর চাচাতো ভাই ।দুজন বেস্ট এয়ারে চাকুরীর সুবাদে তারা আমাদের নানাভাবে সাহায্য করে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে গেল প্যাসেন্জার ওয়েটিং কাউন্টারে ।ইতিমধ্যে তখন শুরু হয়ে গেছে যাত্রীদের বিমানে উঠার পালা। এর মধ্যে আসরের আযানের সময় হয়ে গেলো আমরা কজন দ্রুত নামাজ পড়ে নিলাম ।

এরপর আমরা মানে আমাদের দলের সফরসংগীরা যথাক্রমে আমি ,মা ,আমার ফুপাতো ভাই ইমতিয়াজ , তার খালাতো ভাই আনিস এবং ফুপাতো ভাই সারওয়ার , বন্ধু ডাক্তার আজিজ এবং উনার আম্মা ।সব মিলিয়ে পুরুষ ৫ জন এবং মহিলারা ২জন লাইন ধরে দাড়ালাম সবার শেষে । মনে মনে ভাবছিলাম শেষ পর্যন্ত জায়গা হবে কি না । বিমানে প্রবেশ করে পড়লাম আরেক বিপত্তিতে ।আমরা একসাথে কোথাও জায়গা পাচ্ছিলাম না । অবশেষে এক স্টুয়ার্ড আমাদের কে ইকনমি ক্লাশ থেকে উঠিয়ে নিয়ে বিজনেস ক্লাশে জায়গা করে দিলো। সেখানে আমরা আমাদের যার যার মাকে পাশে নিয়ে নির্বিঘ্নে বসলাম। যাই হউক সব ভাল যার শেষ ভাল আমরা ইকনমির ক্লাশের টিকিটে স্থান পেলাম বিজনেস ক্লাশে ।আল্লাহর অশেষ রহমতে আমাদের শুরুটা বেশ ভালই হল ।



আমরা বেশ কিছু দিক থেকে ভাগ্যবান ছিলাম । আমাদের দলের সিনিয়র সারওয়ার ভাই ছিলেন ।যাকে আমরা ভাই বললেও ওনার বয়স প্রায় ৭০ বছর ছিল। এবং এর মধ্যে তিনি আমাদের সাথে ১৮ তম হজ্ব পালনের জন্য যাচ্ছিলেন। উনি ছিলেন তাই একজন অভিজ্ঞ গাইডের মত । এবং পরবর্তীতে সেটা তিনি প্রতি ক্ষনে ক্ষনে প্রমান করেছিলেন। এবং তিনি না থাকলে আমাদের হজ্বের কাজগুলো এত সহজে করতে পারতামনা।আরেকদিক থেকে আমরা ভাগ্যবান ছিলাম সেটা হল আমাদের আরেক সফরসংগী ডা: আজিজ ভাই যিনি ন্যাশনাল হসপিটালে নাক কান গলা বিশেষজ্ঞ। তিনি আমাদের সময়ে সময়ে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসা সেবা দিয়ে দ্রুত সুস্থ করে তুলতেন ।এমনকি তিনি অন্যরা কেউ সাহায্যর জন্য আসলে শত ক্লান্ত থাকলেও সেবা করতে দ্বিধা করতেন না । আমার দেখা ভাল মানুষগুলোর মধ্যে তিনি ছিলেন একজন।


যাই হউক ঠিক সময়মত আমরা কজন সফরসংগী অবশেষে বিমান যাত্রার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত হলাম । কিন্ত সময় যত ঘনিয়ে এলো আমার মা ততই অস্থির হয়ে উঠলেন কারন এটাই ছিলো তার জীবনের প্রথম বিমানযাত্রা তার ছেলেমানুষী ভয় দেখে তাকে অভয় দিচ্ছিলাম আর মনে মনে বেশ হাসি পাচ্ছিলো ,তাকে দেখে মনে হচ্ছিলো একটি ছোট্ট মেয়ে যে কিনা ভীত এবং একই সাথে কৌতুহলী কি হয় এই ভেবে ।এর মাঝে বিমানের একটা ইন্জিনে কি সমস্যা দেখা দেওয়াতে বিকাল ৪টা পরিবর্তে ঠিক সন্ধ্যা ৬টায় আমাদের বিমান ডানা মেললো সউদী আরবের পবিত্র শহর মদীনার উদ্দেশ্যে ।

বিমানের স্টুয়ার্ড এবং এয়ার হোস্টেসগুলো আমাদেরকে বেশ আপন করে নিলো অল্পক্ষনের মাঝে। আমাদের সাথে তাদের ব্যবহার ছিলো আন্তরিক ।আমার মা তার মানসিক ভীতি অল্প সময়ের ভেতরে কাটিয়ে উঠে আমাকে একের পর এক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে যাচ্ছিলেন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ।আর আমিও বাবার ভূমিকা নিয়ে একের পর এক "কেন"জাতীয় প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার চেষ্টা করছিলাম ।এরমাঝে আমরা বিমানে আমরা মাগরিব এবং এশার নামাজ সীটের মাঝে বসে কোনমতে আদায় করলাম।এরই মাঝে হালকা নাস্তা এরপর ভারী ডিনার সেরে একটা হালকা ঘুম দিয়ে উঠেই দেখি জানালা দিয়ে নীচে পবিত্র মদীনা শহরের আলো ঝলমলে শহর দেখা যাচ্ছে।

মনে পড়লো প্রিয় রসুলের কথা যতই ধীরে ধীরে বিমান মাটির কাছাকাছি চলে আসছিলো ততই মনের তীরে ভীর করলো অনেক স্মৃতিকথা । একদিন এই শহরের তপ্ত মরুর লু হাওয়ার সাথে বয়ে আসলো সিন্গ্ধ শীতল সজীব বাতাসের পরশ । সেদিনকার অধীর আগ্রহে অপেক্ষামান ইয়াসরিববাসীরা চেয়ে দেখলো ধূলায় ধূসরিত ক্লান্ত একদল নরনারী এক জোত্যির্ময় পূরুষের নেতৃত্বে দীপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে আসছে তাদেরই শহরের পানে।সেই পূরুষ আর কেউ নয় আমাদের প্রিয়নবী বিশ্বের জন্য প্রেরিত রহমত, হজরত মুহাম্মাদ (সাঃ)। তিনি যখন এই শহরের পথ ধরে এগিয়ে চললেন বেজে উঠেছিলো কিশোর কিশোরীর হাতে দাফা ।তারা গেয়ে ছিলো সেদিন আমাদের নবীজির নামে প্রশংশামূলক অনেক গান । আজও যেন হাজার বৎসর পূর্বের সেই গান ইথারে ভেসে বেড়াচ্ছে । চোখ বন্ধ করলেই যেন হারিয়ে যাচ্ছিলাম সেই ইতিহাসের পাতার মাঝে ।



অবশেষে আমরা দীর্ঘ প্রায় ০৬ ঘন্টা বিমানযাত্রা শেষে মদীনার প্রিন্স মোহাম্মাদ বিন আব্দুল আজিজ এয়ারপোর্টে আমাদের বিমান অবতরণ করলো। স্টুয়ার্ড আর এয়ারহোস্টেস কে ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা একে একে নেমে আসলাম বিমানের সিড়ি বেয়ে। এরপর শুরু হল একঘেঁয়েমী লাইনে দাঁড়িয়ে ইমিগ্রশনের কাজ গুলো সাড়া।সব কাজ শেষে আমাদের বলা হল আমাদের নিজ নিজ লাগেজ গুলো বুঝে নেয়ার জন্য ।



আমাদেরকে বলা হল আমাদের লাগেজগুলো বাইরে নামানো আছে । এবং বাইরে এসে যে দৃশ্য দেখলাম সেটা অতন্ত্য অপমান জনক ছিলো আমাদের জন্য । বিমানের প্রায় ৪০০ যাত্রীর লাগেজ গুলো কতৃর্পক্ষ এলোমেলো ভাবে ফেলে রেখেছিলো পথের উপর। মনে একটা তৃপ্তির স্বাদ নিয়ে প্রিয় নবীজির শহরে পা রেখে ভাল লাগছিলো সেখানে অল্প সময়ের মধ্যে জায়গা করে নিলো অপমান আর রাগ। আসলেই নবীজি নেই তাই আজকের এই মদীনাবাসীরা ভুলে গেছে আল্লাহর ঘরের অতিথিদের কিভাবে বরণ করতে হয় ।


যা হউক কোন মতে আমরা একে একে আমাদের লাগেজগুলো খুঁজে বের করে বাসে উঠিয়ে বসলাম । আমাদের মাঝে সারওয়ার ভাই একের পর এক স্থান দেখিয়ে গাইডের মত বর্ননা করে যাচ্ছিলেন তার নিজস্ব ভংগীতে।কিছুক্ষনের মধ্যে আমাদের বাস রওয়ানা দিলো হোটেলে উদ্দেশ্যে । আমরা অবশেষে যখন হোটেলে পৌছাঁলাম তখন প্রায় রাত ১২টা বাজে । আমরা মালামাল হোটেলের রুমে উঠিয়ে সেদিন ঘুমাতে গেলাম ।ভোরে ফজরের নামাজের সময় আবার উঠে আমরা রওয়ানা হলাম জীবনে প্রথমবারের মত নবীজীর প্রিয় মসজিদ মসজিদে নব্বীতে নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে ।

Thursday, March 12, 2009

হজ্বের সেই দিনগুলি - ৩




হজ্বের প্রস্ততি

হজ্বে যাবার জন্য ২০০৭ বছরের শুরু থেকেই মানসিকভাবে প্রস্ততি নেয়া শুরু করলাম । এ বিষয়ে আমাকে সবচাইতে বেশী সাহায্য করেছিলো আমার ফুপাতো এক বড়ভাই যিনি ইতিমধ্যে একবার হজ্ব সম্পন্ন করে ২য়বার তার আম্মার জন্য বদলী হজ্বের জন্যে পস্ততি নিচ্ছিলেন । চাকুরীগত কারনে আমার জন্য এই বিষয়ে সময় দেয়াটা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছিলো, বিশেষ করে কোন এজেন্সীর মাধ্যমে হজ্বে যাবো এই বিষয়ে সির্ধান্ত নেয়া । অবশেষে আমার সেই ফুপাত ভাই এর পরিচিত কিছু আত্মীয় এবং বন্ধুর সাথে যাওয়ার জন্য মনস্থির করলাম এবং সেইভাবে সব ধরনের প্রস্ততি নেয়া শুরু করলাম ।হজ্বে যাবার জন্য সব চাইতে বেশী জরুরী যেই বিষয়টি আমি মনে করি তা হল কি উদ্দেশ্যে আমি হজ্ব করছি । এই হজ্ব কি আমি আমার নিজ সন্তষ্টির জন্য করছি ? এই হজ্ব কি আমি আমার সামাজিক সম্মান ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করবার জন্য করছি ? এই হজ্ব কি আমি কারও চাপে পড়ে করছি? এই হজ্ব কি আমি শুধুমাত্র একজন মুসলমান হিসেবে ফরয দায়িত্ব তদুপরি আল্লাহর সন্তষ্টির জন্য করছি?

আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে এই হজ্বের উদ্দেশ্য প্রথমত আল্লাহ আমাকে হজ্বে যাবার জন্য শারিরীক এবং মানসিকভাবে যোগ্য করেছেন তার এই নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আমি হজ্বে যাচ্ছি ।আমি হজ্বে যাচ্ছি শুধু আল্লাহকে খুশী করার জন্য এবং সর্বশেষে আমি আল্লাহর বান্দা হিসেবে আমার উপর ফরয একটি দায়িত্ব সম্পন্ন করবার জন্য আমি হজ্বে যাচ্ছি ।

মানসিকভাবে প্রস্ততি গ্রহনের সাথে সাথে আরেকটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত সেটা হল শারিরীক সুস্থতার প্রতি । অনেক সময় দেখা যায় এই হজ্বের বিষয়ে অনেকের কাছ থেকে নানা ধরনের মন্তব্য শুনে অনেকে হজ্বে যাবার পূর্বেই অসুস্থ হয়ে যান । হজ্ব আল্লাহর ইবাদত সমূহের মধ্যে একটি শারিরীক দিক থেকে কষ্টকর একটি ইবাদত । কিন্ত তাই বলে এতে ঘাবড়াবার কিছু নেই । কারন প্রতিবছর নানা দেশ থেকে অনেক বৃদ্ধ বৃদ্ধারা এই হজ্ব করছেন এবং এই বিষয়ে সবচেয়ে জরুরী বিষয় একটি সেটি হল মনের জোর । আর হজ্বে যাবার আগে প্রচুর পরিমানে হাঁটা এবং সুষম খাদ‌্য গ্রহন সেইসাথে হজ্বের আনুষ্ঠানিকতার উপর পড়াশোনাই একজন হাজী কে সঠিক ভাবে গড়ে তোলে আল্লাহর ঘরে একজন প্রকৃত মেহমান হিসেবে উপস্থিত হবার।



হজ্ব বিষয়ক পড়াশোনা

হজ্বের বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের বইয়ের বাজারে পাওয়া যায় কিন্ত এ বিষয়ে যেই সম্যসায় একজন নতুন হাজী প্রায় পড়ে থাকেন সেটি হল হজ্বের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় তারতম্য ।বিশেষ করে কোন কোন বইতে দোয়া দরুদের আধিক্য দেখা যায় বেশী অন্য বইগুলোর তুলনায়।ফলে কোনটি সঠিক আর কোনটি বেঠিক এই দুইয়ের দোলাচলে পড়ে হাজীরা সঠিক দিকনির্দেশনা পেতে ব্যর্থ হন। এক্ষেত্রে ভাল হয় যদি বেশ কিছু বই পড়া যায় তাহলে পাঠকের কাছে একটি ধারনা তৈরী হয়ে যাবে ।কারন সঠিক বিষয়গুলো অধিকসংখ্যক বইতে একইরকম পাওয়া যাবে । এছাড়া আরো ভালো হয় যদি কোন পূর্বের হজ্বের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কোন আলেম হাজ্বীর কাছ থেকে কিছু জানা যায়। এছাড়া প্রতিবছর হজ্বের পূর্বে বিভিন্ন এজেন্সী গুলো হজ্ব মেলার আয়োজন করে থাকে । সেই মেলায় যেমন একদিকে অনেকগুলো এজেন্সী গুলোকে একস্থানে পাওয়ায় তাদের মধ্যে তুলনা করে নিজ বাজেটে মধ্যে একটি ভাল হজ্ব প্যাকেজ বেছে নেয়া যায় । অন্যদিকে এই এজেন্সীগুলো তাদের নিজ নিজ লিফলেটের পাশাপাশি কিছু হজ্ব বিষয়ক নির্দেশিকা বিনামুল্যে সরবরাহ করে থাকে । সেই বইগুলর মাধ্যমে এই বিষয়ে একটি ভাল ধারনা লাভ করা যায়।
এছাড়া আরো ভাল হয় যদি সম্ভব হয় হজ্বের উপর ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলের একটি ডকুমেন্টারী ফিল্ম "ইনসাইড মক্কা"এই ভিডিওটি দেখার । ভিডিওটি বসুন্ধরা বা যে কোন ভাল একটি কালেকশনের দোকানে খোঁজ করলে পাওয়া যাবে ।



হজ্ব এজেন্সী নির্বাচন

একদিকে মানসিক আরেকদিকে শারিরীকভাবে প্রস্ততি গ্রহন চলছে আরেকদিকে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিলাম এজেন্সীর সাথে । একটি বিষয়ে খেয়াল রাখা উচিত এজেন্সী নির্বাচনে । একবারে নতুনদের জন্য সবচেয়ে ভাল হয় পরিচিতিদের মধ্যে যারা একবার হজ্ব করে এসেছেন তাদের মাধ্যমে খোঁজখবর নেয়া তাদের নিজ নিজ এজেন্সীগুলো সম্পর্কে । আর কারো পক্ষে যদি সেটা সম্ভব না হয় তাহলে তার জন্য উচিত হজ্ব মেলায় গিয়ে সরেজমিনে যাচাই করে নেয়া তার জন্য কোন এজেন্সী সবচাইতে ভাল হবে ।


সাথে কি নেব

অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষন চলে এলো একসময় যেই দিনটির অপেক্ষায় ছিলাম এতদিন । আমার সাথে আমার মা ছিলেন আমার জীবনের প্রথম হজ্বের সংগীনি হিসেবে । আমি আমার প্রস্ততির সাথে সাথে আমার মাকে একই সাথে সাহায্য করছিলাম তাঁর নিজ প্রস্ততির বিষয়ে । একে একে যখন সবধরনের আনুষাংগিক বিষয়গুলো যেমন মোয়াল্লেমের ফী , বিমান টিকিট এবং পাসপোর্টের জন্য প্রয়োজনীয় ফর্ম পূরন করা এই বিষয়গুলি সমাধান করছিলাম । একইসাথে বাজার থেকে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিষ যেমন ইহরামের কাপড় , মুজদালিফায় অবস্থানের জন্য স্লিপিং ব্যাগ এরকম আরো টুকিটাকি বহু জিনিষ কিনতে হচ্ছিলো দোকান থেকে। এই জিনিষগুলো একটি বর্ননা সাথে কোথা থেকে কেনা যায় সেটার একটি তালিকা দেয়া হল আপনাদের সুবিধার্থে ।




১। ইহরামের কাপড় - ০২ সেট ( সূতির কাপরের এক সেট আরেকটি তোয়ালে কাপরের সেট নেয়া যেতে পারে রাতে মুযদালিফার শীতের বিষয়টি মাথায় রেখে)



২। মুযদালিফায় রাতে খোলা মাঠে শোবার জন্য এক সেট স্লিপিং ব্যাগ বা হালকা বিছানা ।

৩।সম্পূর্ন ভ্রমনের বিষয়টি মাথায় রেখে পাজামা এবং পান্জাবীর সেট মোট ৪/৫ টি নেয়া যেতে পারে । এই পোশাকে স্বাছন্দ্যবোধ না করলে ঢিলেঢালা প্যান্ট শার্ট ও সাথে নিতে পারেন।এবং হজ্বের আগে বা পরে পায়ে দেবার জন্য স্যান্ডল শ্যু নেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে ।কারন মসজিদে প্রবেশের সময় জুতা খোলার ঝামেলা কম হবে।তবে বিমানে ভ্রমনের সময় সমস্যা না হলে স্যান্ডল শ্যু খারাপ নয়। যেমন আমাদের সময় বিমানে গুটি কয়েকজন বাদে আমরা সব হজ্ব যাত্রীদের পোশাক ছিল পাজামা পান্জাবী এবং স্যান্ডল শ্যু ।



মহিলাদের ক্ষেত্রে ভাল হয় সালোয়ার কামিজের ৪/৫ টি সেট সাথে নিলে ।তাছাড়া হেজাবের ২/৩ টি সেট সাথে থাকা ভাল আর কালো হেজাবের পাশাপাশি সাদা হেজাব বিশেষ করে মাথায় স্কার্ফ বা ওড়না নিলে ভাল কারন রোদে কালোর তুলনায় সাদা বা হালকা রং এর কাপরে তাপ শোষন কম হয়।

৪। জুতা রাখার একটি কাপড়ের ব্যাগ।

৫। ২/৩ টি মাথায় দেবার টুপি।



৬।একটি কোমরবন্ধনী ইহরামের কাপড়কে বেঁধে রাখাবার জন্য।এই বন্ধনীতে একটি পকেট থাকে বিশেষ করে টাকা রাখবার জন্য।

৭। আরেকটি কাপড়ের ব্যাগ গলায় ঝুলিয়ে রাখবার জন্য যেখানে পাসপোর্ট, তাসবীহ ইত্যাদি রাখবার জন্য।এই ব্যাগটি রেডিমেট পাওয়া যায় দোকানে ।

৮। টয়লেট্রিজ সামগ্রী যেমন সাবান ,টুথপেস্ট,সেভিং ফোম,রেজার তোয়ালে বা গামছা ইত্যাদি সাথে নেয়া ।এক্ষেত্রে বিশেষ করে ভ্রমনের সময় হিসেব করে কাপড় ধোবার জন্য গুড়া সাবানের প্যাকেট কিনলে অনেক ভাল। যা পরবর্তীতে অনেক কম কষ্টে কাপড় ধোয়ার মত একটি কাজকে সহজ করে দেয় ।

৯।গুটি কয়েক বই যেখানেপছন্দের দোয়া দরুদ আছে । এছাড়া সব স্থানে বিশেষ করে মসজিদগুলোতে কোরআন শরীফের সহজলভ্যতা আছে ।তাই কষ্ট করে বাংলাদেশ থেকে বহন না করলেও চলবে ।

১০।মোবাইল এবং চার্জার ।কিছু সাদা কাগজ এবং কলম সাথে রাখা ।

১১। সাথে কালো গগলস নিলে ভাল হয় কারন কোন কোন সময় প্রখর রোদে চোখে সমস্যা হতে পারে ।

হজ্বের কেনাকাটার জন্য ঢাকায় দুটি স্থান বেশ প্রসিদ্ধ ।একটি হচ্ছে বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ গেটের পাশের মার্কেট টি আরেকটি হচ্ছে কাকরাইলের তাবলীগ মসজিদের ভেতরে অবস্থিত একটি দোকান। এই জায়গা গুলো ছাড়াও অন্যান্য মার্কেট গুলোতে হজ্বের মওসুমে এই সব জিনিষ কিনতে পাওয়া যায় ।


এছাড়া আর ও ভাল হয় হজ্বের গাইড বইগুলো থেকে তালিকা থেকে একটা আইডিয়া নিয়ে নিজের পছন্দ মোতাবেক একটি তালিকা পূর্ব থেকে তৈরী করে নেয়া । তবে যে বিষয়টি সব সময় মনে রাখা উচিত যে হজ্বের সফর বা ভ্রমন অন্যান্য দেশ ভ্রমন থেকে একেবারেই অন্যরকম এক ভ্রমন ।তাই এই ভ্রমনে সাথে কি নেবেন এবং নিবেন না তা নির্ভর করছে আপনার হজ্ব কে কেন্দ্র করে ।আরেকটি বিষয় সবসময় হালকা জিনিষপত্র সাথে থাকলে বহনের সুবিধা থাকে সে বিষয়টি মনে রাখা ভাল ।

চলবে ....।

নিচের লিন্কে মক্কার হারেম শরীফে একজন মুয়াজ্জিন সুললিত কন্ঠের আযানের ভিডিও দেয়া হল । আশা করি ভাল লাগবে।


Wednesday, March 11, 2009

হজ্বের সেই দিনগুলো - ২



হজ্বে সেই প্রচুর অর্থের ব্যয় হয় তা কি দান করা উত্তম নয় ?

প্রতিবছর দেশ থেকে প্রচুর সংখ্যক হাজী হজ্ব পালনের জন্য যে প্রচুর অর্থের ব্যয় করেন তার পরিবর্তে সেই অর্থ দেশের গরীব দুঃখীদের মাঝে বিতরন করলে সেটা কি আরো উত্তম নয় কি ? প্রতিবছর হজ্বের মওসুমে এই সকল প্রশ্ন ফিরে ফিরে আমাদের মনে আসে । আবার কোন কোন ব্যক্তি এই বিষয়ে হৃদয় নিংড়ানো ভাষায় অত্যন্ত মর্মস্পর্শী গল্প ফেঁদে বসেন ।

এই ধরনের গল্প পড়ে আমরা অনেকে মনে মনে ধরে নেই আসলে হজ্বে যাবার দরকার কি ? এই অর্থ গরীব দুঃখীদের মাঝে দান করা কি আরও ন্যায় সংগত নয় ?
ইসলামে প্রতিটি ক্ষেত্রে এই দান কে সব সময় অগ্রাধিকার এবং উৎসাহিত করা হয়েছে । ।ইসলাম কখোনো ভুলে যেতে বলেননি পাশে অনাহারে থাকা উপবাসী প্রতিবেশীর কথা ।আর সেজন্য দারিদ্রতা নামক অভিশাপ থেকে সমাজকে মুক্ত রাখার জন্য ইসলাম যাকাত কে করেছে ফরয প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য।আর দানের জন্য জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে উন্মুক্ত রেখেছে দরিদ্র মুসলিম ভাইকে সাহায্য করার জন্য ।আমরা যদি প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমান আজ সঠিকভাবে যাকাত প্রদান করতাম তা হলে হজ্বের টাকা দান করার প্রশ্ন উঠতোনা । একটি কথা মনে রাখা উচিত সকলের হাত কখোনো পায়ের পরিপূরক হতে পারেনা হয়তো ঠেকার কাজ করানো যেতে পারে ।তবে সেটা কখোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারেনা । তাই যে সমাজে যাকাত কে ফাঁকি দেয়া হয় সেখানে এক মাঝারী আয়ের ব্যক্তির হজ্বের উদ্দেশ্যে সারা জীবনের জমানো টাকায় কখোনো দারিদ্রতা দুর হয়না ।

কিন্ত একটি কথা আমরা সকলে ভুলে যাই যে ইসলাম কোথাও কখোনো ভারসাম্য নষ্ট করেনি। একজন সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য হজ্ব ফরয হওয়ার পূর্বে সাধারনত তার জন্য যাকাত ফরয হয় । আর তার হজ্বে যাবার পূর্বে তার জন্য ইতিমধ্যে ইসলাম তাকে দায়িত্ব প্রদান করে সমাজের দুঃখীদের প্রতি তার সামাজিক দায়িত্ব পালনের এবং এভাবে সে একজন মুসলমান হিসেবে এগিয়ে যায় ইসলামের পথে পরিপূর্নতার দিকে ।এখানে প্রথমেই উল্লেখ্য করা হয়েছে ইসলাম একটি ঘর যে ঘরটি ৫টি খুঁটির উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে ।আর সে ঘরের একজন স্বার্থক বাসিন্দা হিসেবে সে ঘরে বাস করতে হলে তাকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে এর প্রতিটি খুঁটির দিকে । কারন এই খুঁটির সাথে ঘরটির অস্তিত্ব এবং তার অস্তিত্বও জড়িত। তাই একটি খুঁটি দিয়ে আরেকটি খুঁটিকে প্রতিস্থাপন নয় বরং প্রতিটি খুঁটিকে প্রয়োজনীতার আলোকে গুরত্ব সহকারে বিচার করতে হবে ।এ প্রসংগে সূরা আল ইমরানের আয়াত ৯৭ আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন যে




"এতে রয়েছে মকামে ইব্রাহীমের মত প্রকৃষ্ট নিদর্শন। আর যে, লোক এর ভেতরে প্রবেশ করেছে, সে নিরাপত্তা লাভ করেছে। আর এ ঘরের হজ্ব করা হলো মানুষের উপর আল্লাহর প্রাপ্য; যে লোকের সামর্থ্য রয়েছে এ পর্যন্ত পৌছার। আর যে লোক তা মানে না। আল্লাহ সারা বিশ্বের কোন কিছুরই পরোয়া করেন না।





আমার দেখা অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি আমাদের দেশে প্রতিবছর যে বিপুল সংখ্যক হাজী হজ্ব করতে যায় তার অধিকাংশই মধ্যবিত্ত বা গ্রামের প্রবাসী ব্যক্তির গরীব পিতা যে কিনা তার ছেলের অনেক দিনের কষ্টের জমানো টাকায় হজ্ব করছে ।আর সে অনুপাতে বিত্তশালীদের সংখ্যা অনেক কম ।তাই গরীব দুঃখীদের সাহায্য করার জন্য এই সকল লোকের অর্থ কে উপজীব্য নয় বরং সেই বিত্তশালীদের তাদের উপার্জিত সাদা আর কালো টাকার জন্য সঠিক যাকাত প্রদানের জন্য এবং গরীবকে দানের জন্য উৎসাহ প্রদানের জন্য মর্মস্পর্শী ভাষায় কাহিনী লিখে তাদের কে ইসলামের সঠিক পথে পরিচালিত করাই উত্তম বলে মনে করি ।দেহের পা এবং হাত যদি স্বস্থানে থেকে নিজ নিজ কাজ সঠিক ভাবে করে তাহলে কোন বিকল্পর প্রশ্নই আসেনা ।তাই হজ্বের টাকা দানের বিকল্প হিসেবে নয় বরং হজ্ব পালনের জন্যই বিবেচ্য বলে মনে করি।


পবিত্র কোরআনে হজ্বের গুরুত্ব :






সূরা আল বাক্বারাহ, আয়াত সংখ্যাঃ ১২৫

যখন আমি কা’বা গৃহকে মানুষের জন্যে সম্মিলন স্থল ও শান্তির আলয় করলাম, আর তোমরা ইব্রাহীমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাযের জায়গা বানাও এবং আমি ইব্রাহীম ও ইসমাঈলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তওয়াফকারী, অবস্থানকারী ও রুকু-সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ।



সূরা আল বাক্বারাহ, আয়াত সংখ্যাঃ ১৮৫

নিঃসন্দেহে সাফা ও মারওয়া আল্লাহ তা’আলার নিদর্শন গুলোর অন্যতম। সুতরাং যারা কা’বা ঘরে হজ্ব বা ওমরাহ পালন করে, তাদের পক্ষে এ দুটিতে প্রদক্ষিণ করাতে কোন দোষ নেই। বরং কেউ যদি স্বেচ্ছায় কিছু নেকীর কাজ করে, তবে আল্লাহ তা’আলার অবশ্যই তা অবগত হবেন এবং তার সে আমলের সঠিক মুল্য দেবেন।

সূরা আল বাক্বারাহ, আয়াত সংখ্যাঃ ১৯৬

আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব ওমরাহ পরিপূর্ণ ভাবে পালন কর। যদি তোমরা বাধা প্রাপ্ত হও, তাহলে কোরবানীর জন্য যাকিছু সহজলভ্য, তাই তোমাদের উপর ধার্য। আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা মুন্ডন করবে না, যতক্ষণ না কোরবাণী যথাস্থানে পৌছে যাবে। যারা তোমাদের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়বে কিংবা মাথায় যদি কোন কষ্ট থাকে, তাহলে তার পরিবর্তে রোজা করবে কিংবা খয়রাত দেবে অথবা কুরবানী করবে। আর তোমাদের মধ্যে যারা হজ্জ্ব ওমরাহ একত্রে একই সাথে পালন করতে চাও, তবে যাকিছু সহজলভ্য, তা দিয়ে কুরবানী করাই তার উপর কর্তব্য। বস্তুতঃ যারা কোরবানীর পশু পাবে না, তারা হজ্জ্বের দিনগুলোর মধ্যে রোজা রাখবে তিনটি আর সাতটি রোযা রাখবে ফিরে যাবার পর। এভাবে দশটি রোযা পূর্ণ হয়ে যাবে। এ নির্দেশটি তাদের জন্য, যাদের পরিবার পরিজন মসজিদুল হারামের আশে-পাশে বসবাস করে না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক। সন্দেহাতীতভাবে জেনো যে, আল্লাহর আযাব বড়ই কঠিন।


আয়াত সংখ্যাঃ ১৯৭

হজ্জ্বে কয়েকটি মাস আছে সুবিদিত। এসব মাসে যে লোক হজ্জ্বের পরিপূর্ণ নিয়ত করবে, তার পক্ষে স্ত্রীও সাথে নিরাভরণ হওয়া জায়েজ নয়। না অশোভন কোন কাজ করা, না ঝাগড়া-বিবাদ করা হজ্জ্বের সেই সময় জায়েজ নয়। আর তোমরা যাকিছু সৎকাজ কর, আল্লাহ তো জানেন। আর তোমরা পাথেয় সাথে নিয়ে নাও। নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম পাথেয় হচ্ছে আল্লাহর ভয়। আর আমাকে ভয় করতে থাক, হে বুদ্ধিমানগন! তোমাদের উপর তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করায় কোন পাপ নেই।

আয়াত সংখ্যাঃ ১৯৮তোমাদের উপর তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষন করায় কোন পাপ নেই। অতঃপর যখন তওয়াফের জন্য ফিরে আসবে আরাফাত থেকে, তখন মাশ‘ আরে-হারামের নিকটে আল্লাহকে স্মরণ কর। আর তাঁকে স্মরণ কর তেমনি করে, যেমন তোমাদিগকে হেদায়েত করা হয়েছে। আর নিশ্চয়ই ইতিপূর্বে তোমরা ছিলে অজ্ঞ।

আয়াত সংখ্যাঃ ১৯৯অতঃপর তওয়াফের জন্যে দ্রুতগতিতে সেখান থেকে ফিরে আস, যেখান থেকে সবাই ফিরে। আর আল্লাহর কাছেই মাগফেরাত কামনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাকারী, করুনাময়।

আয়াত সংখ্যাঃ ২০০

আর অতঃপর যখন হজ্জ্বের যাবতীয় অনুষ্ঠানক্রিয়াদি সমাপ্ত করে সারবে, তখন স্মরণ করবে আল্লাহকে, যেমন করে তোমরা স্মরণ করতে নিজেদের বাপ-দাদাদেরকে; বরং তার চেয়েও বেশী স্মরণ করবে। তারপর অনেকে তো বলে যে পরওয়াদেগার! আমাদিগকে দুনিয়াতে দান কর। অথচ তার জন্যে পরকালে কোন অংশ নেই।


সূরা আল ইমরান, আয়াত সংখ্যাঃ ৯৬ ও ৯৭

নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম ঘর যা মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ ঘর, যা মক্কায় অবস্থিত এবং সারা জাহানের মানুষের জন্য হেদায়েত ও বরকতময়।

এতে রয়েছে মকামে ইব্রাহীমের মত প্রকৃষ্ট নিদর্শন। আর যে, লোক এর ভেতরে প্রবেশ করেছে, সে নিরাপত্তা লাভ করেছে। আর এ ঘরের হজ্ব করা হলো মানুষের উপর আল্লাহর প্রাপ্য; যে লোকের সামর্থ্য রয়েছে এ পর্যন্ত পৌছার। আর যে লোক তা মানে না। আল্লাহ সারা বিশ্বের কোন কিছুরই পরোয়া করেন না।

সূরা হাজ্ব আয়াত সংখ্যা ২৬ থেকে ২৯ পর্যন্ত

যখন আমি ইব্রাহীমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়েছিলাম যে, আমার সাথে কাউকে শরীক করো না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারীদের জন্যে, নামাযে দন্ডায়মানদের জন্যে এবং রকু সেজদাকারীদের জন্যে।




এবং মানুষের মধ্যে হজ্বের জন্যে ঘোষণা প্রচার কর। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে।

যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থান পর্যন্ত পৌছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে তাঁর দেয়া চতুস্পদ জন্তু যবেহ করার সময়। অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুঃস্থ-অভাবগ্রস্থকে আহার করাও।

এরপর তারা যেন দৈহিক ময়লা দূর করে দেয়, তাদের মানত পূর্ণ করে এবং এই সুসংরক্ষিত গৃহের তাওয়াফ করে।

আল ফাতহ, আয়াত সংখ্যাঃ ২৭

আল্লাহ তাঁর রসূলকে সত্য স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আল্লাহ চাহেন তো তোমরা অবশ্যই মসজিদে হারামে প্রবেশ করবে নিরাপদে মস্তকমুন্ডিত অবস্থায় এবং কেশ কর্তিত অবস্থায়। তোমরা কাউকে ভয় করবে না। অতঃপর তিনি জানেন যা তোমরা জান না। এছাড়াও তিনি দিয়েছেন তোমাদেরকে একটি আসন্ন বিজয়।


পবিত্র কোরআনে বর্ণিত উপরোক্ত আয়াতগুলো পর্যালোচনা করে হজ্বের উপর আল্লাহতায়ালার আরোপিত প্রয়োজনীতা সম্পর্কে একটি ধারনা পাওয়া যায়।

হজ্বের সেই দিনগুলি-১





"লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক ..। "

শৈশবে দেখা সেই হজ্বের দৃশ্য এখনও চোখে ভাসে । সাদা ইহরামের কাপড় পরিহিত লাখো হাজীর কন্ঠে একই সুর আর মনে সেই একই তাওহীদের বাণী । লাখো কন্ঠে সম্মিলিত গর্জন "লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক ----- আমি হাজির হে আল্লাহ, আমি হাজির । আমি হাজির, নেই কোন শরীক তোমার ,তুমি এক । আমি হাজির সকল নেয়ামত সে শুধু তোমারই । সকল সাম্রাজ্যর মালিক একমাত্র তুমি। নেই কোন তোমার শরীক "

সুপ্ত বাসনার সূত্রপাত সেই থেকে । ধর্ম বিষয়টি যদিও কখোনো আমার উপর পরিবার পক্ষ থেকে সেভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়নি । কিন্ত ছোটবেলা থেকেই দাদীর কাছ থেকে হাতে খড়ি হয়েছিলো ধর্মীয় আচার আচরণ বিশেষ করে নামাজ শিক্ষার। নিয়মিত না হলেও নামাজ পড়তাম ছোটবেলা থেকেই ।কোন ধরনের চাপ না থাকা স্বত্তেও বরং দাদীর অনুপ্রেরনায় ভালবাসতে শুরু করলাম পিতৃপ্রদত্ত ইসলাম ধর্মকে।

ছোটবেলা থেকে লক্ষ্য করতাম প্রতিবছর হজ্বে যে সকল হাজী বিশেষ করে আমাদের দেশ থেকে অংশ নিতেন তার অধিকাংশ ছিলেন ৬৫ এর উর্ধ্বে ।ফলে ধারণা করে নিয়েছিলাম হজ্বে যাবার উপযুক্ত বয়স হয়ত এটাই । কিন্ত বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমার এই ধারণা ভুল বলে প্রমানিত হল। যদিও এখনও আমাদের দেশে অনেকের মাঝে আজও এই ধারনা পোষন করতে দেখা যায়।
আর এই ধারনার পেছনে কাজ করে থাকে নানাবিধ কারন । কেউ কেউ আছেন সব বুঝেন এবং জানেন কিন্ত এই ভয়ে হজ্বে যান না কারন হজ্ব থেকে এসে তাকে নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করতে হবে এবং উছৃন্খলতা পরিহার করে একজন মুসলমান হিসেবে জীবনযাপন করতে হবে ।

আর কেউবা এসবের ধার ধারেন না মোটেও তারা মূলত হজ্বে যান কারন নামের পাশে আলহাজ্ব শব্দটি তাদের রাজনৈতিক,সামাজিক এবং ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য। আর এর প্রমান হজ্ব থেকে আসার সময় কতিপয় হাজীর লাগেজে ব্যাগেজে এবং সর্বত্র নামের আগে আলহাজ্ব শব্দটির প্রকট ব্যবহার ।

আর কারও কারও অভিপ্রায় আরো হাস্যকর তারা মনে করেন হজ্বে যাবার উপযুক্ত সময় বৃদ্ধকালে ,মৃত্যুর পূর্বে জীবনকে সম্পূর্নভাবে উপভোগ করে সেটা ন্যায় বা অন্যায় যে পথেই হউক । তারপর হজ্বে গিয়েসব গুনাহ মাফ চেয়ে বেহেশত নিশ্চিত করা ।




হজ্ব কেন?

একজন সাধারন মুসলমান হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের হজ্ব সম্পর্কে এইটুকু মৌলিক জ্ঞান থাকা দরকার যে ,হজ্ব হচ্ছে ইসলামের মূল ৫টি স্তম্ভের একটি স্তম্ভ বা খুঁটি । একটি ঘরের অস্তিত্ব যেমন এর খুঁটির উপর নির্ভর করে এবং এর আবশ্যকীয় যে কোন একটি খুঁটির অভাবে যেমন ঘরটির অস্তিত্বর ভারসাম্যর ব্যাঘাত ঘটে ।ঠিক তেমনি ইসলামের যে ৫টি খুঁটির উপর দাঁড়িয়ে আছে তার একটি খুঁটির নাম হজ্ব।অতএব আমি যদি নিজেকে মুসলিম হিসেবে নিজেকে দাবী করি এবং এই ইসলাম নামক ঘরটির ছায়ায় স্থান নিতে চাই তাহলে এর প্রতিটি খুঁটির সাথে নিজেকে আত্মিক এবং শারিরীকভাবে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে ।এই ঘরের প্রতিটিট নিয়ম কানুন আমাকে মেনে চলতে হবে । এখানে একটি প্রশ্ন মনে স্বাভাবিক ভাবে জাগতেপারে । ৫টি স্তম্ভের মধ্যে ১টি হল নামাজ আর বাকী ৪টি হল যাকাত ,রোজা,হজ্ব এবং সবার আগে আল্লাহর একত্ববাদের উপর ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপন করা ।এখন প্রতিটি মুসলমান নামাজ ,রোজা এবং ঈমান স্থাপনের কাজগুলি করতে পারলেও সবার পক্ষে কি যাকাত প্রদান এবং হজ্বপালন করা কি সম্ভবপর হয় ?কারন এই দুটো সম্পূর্নভাবে নির্ভর করে সামর্থ্যর উপর।

যাকাত প্রদানের বিষয়টি যেমন সম্পদের নির্দিষ্ট পরিমান না থাকলে প্রযোজ্য হয়না ঠিক তেমনি হজ্ব পালনের আর্থিক বা শারিরীক সামর্থ্য না থাকলে একইভাবে সেই মুসলমানের উপর হজ্ব ফরয হয়না ।তবে ক্ষেত্রে বিশেষে যদি শুধুমাত্র আর্থিক সামর্থ্য থাকলে এবং শারিরীকভাবে সামর্থ্য না থাকলে সেক্ষেত্রে একজন অসুস্থ বা বয়স্ক হাজী আরেকজন হাজীর মাধ্যমে বদলী হজ্ব করিয়ে নিতে পারে ।
তাই আল্লাহ যখন কোন মুসলিম পুরুষ বা মহিলাকে হজ্বে পালনের সামর্থ্য দেন তার উচিত সময়ক্ষেপন না করে দ্রুত হজ্বের প্রস্তুতি গ্রহণ করা ।মহিলাদের ক্ষেত্রে হজ্বে যাবার সময় অবশ্যই সফর সংগী হিসেবে ধর্মীয় বিধি অনুযায়ী মাহরমের আত্মীয়ের সাথে যাওয়ায় উত্তমও। মনে রাখতে হবে যখন থেকে একজন মুসলিম হজ্বে যাবার সামর্থ্য আল্লাহ তাকে দান করেন তখন থেকেই সেই মুসলিম আল্লাহর কাছে প্রতিটি মূহুর্তের জন্য দায়বদ্ধ থাকেন সময় ক্ষেপনের জন্য ।

যাকে আল্লাহ তার নিয়ামতের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন এবং পরিপূর্ণ করেন । এবং হজ্বে যাবার সামর্থ্য দান করেন ।তখনই তার জন্য হ্জ্ব ফরয হয়ে যায় । এবং কে জানে এই বছরের পরেই হয়ত তার সামর্থ্যকে কেড়ে নেয়া হবে অথবা সেই ব্যক্তী চির বিদায় নিবে এই পৃথিবীর বুক থেকে ।তাই সময় থাকতেই আল্লাহর ঘরে মেহমান হবার আমন্ত্রণ পত্র যারা পেয়েছেন ,তাদের উচিত দেরী না করে আল্লাহ পাকের দরবারের দাওয়াত কবুল করে নেয়া । মনে রাখবেন এই আমন্ত্রণ আল্লাহ পাক অনেকের ভাগ্যে এই জীবনে দান করেন না যা আপনি পেয়েছেন।